যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

 যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি হলো যাকাত। ইসলামে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) যখন ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় গমন করেন এবং ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তখন সে রাজ্যে  যাকাত চালু হয়।

যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

তবে যাকাত কতটুকু দিতে হবে তা অনেকের কাছে বিতর্কের বিষয়। কিন্তু ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে মুসলমানদের পবিত্র মহাগ্রন্থ কুরআনে যাকাতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ

 বিধান হচ্ছে যাকাত। নামাজ ও যাকাত হল ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক ইবাদত। কুরআনের অসংখ্য অনুচ্ছেদে নামাজ ও যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এর কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর অনুগত বান্দাদের আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি চিরন্তন পুরস্কার, করুণা ও ক্ষমার কথা বলা হয়েছে। 

কুরআনে এক আয়াতে বর্ণিত  আছে , “তোমরা সালাত আদায় কর এবং যাকাত প্রদান কর। তোমরা যে উত্তম কাজ নিজেদের জন্য অগ্রে প্রেরণ করবে তা আল্লাহর নিকটে পাবে। তোমরা যা করো তা মহান আল্লাহ  দেখছেন ।” (সূরা আল বাকারা ১১০)

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য কখন এবং কিভাবে দিতে হবেঃ

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য, যাকাত সাধারণত রমজান মাসে দেওয়া হয়। কিন্তু কতটুকু যাকাত দিতে হবে এবং তা কি মানুষের স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পদের উপর মূল্যায়ন করা হবে নাকি উভয়ের উপর ?ব্যাংক বা সঞ্চয় পত্রের উপর রক্ষিত টাকার মূল্য বা এক বছরের উপর বেশি সময় ধরে রাখা মূল্যবান জিনিস পত্রের মূল্য কি যাকাতের জন্য বিবেচনা করা উচিত।

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য কখন এবং কিভাবে দিতে হবেঃ

    নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী মুসলিম সকল নর-নারীকে যাকাত দিতে হবে। যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুযায়ী নিশাব পরিমাণ সম্পদ সঞ্চয় করার পর একটি পূর্ণ বছর অতিবাহিত হলে তাকে অবশ্যই আগের বছরের যাকাত দিতে হবে। যাই হোক যদি কোন ব্যক্তির যাকাতের নিসাবের মালিকানা ছাড়াও ঋণ থাকে,তবে ঋণ বিয়োগ করে সম্পদের নিসাব পরিমাণের মালিক হলে তাকে যাকাত দিতে হবে। 

    আরও পড়ুনঃ রমজানের প্রথম দশ দিনের ফজিলত

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুযায়ী যাকাত আবশ্যক হয়ে যাওয়ার পর,যদি তা পরিশোধ না করে অর্থ ব্যয়  করে,তবুও তাকে পুরনো যাকাত পূরণ করতে হবে। বর্তমানে একজন ব্যক্তির সাড়ে সাত ভরি সোনা বা তার সমপরিমাণ টাকা এক বছরের জন্য থাকে তাহলে তাকে যাকাত দিতে হবে। ৮৫ গ্রাম / সাড়ে সাত ভরি সোনার দাম যাকাত হিসেবে ধরা উচিত। অন্য কথায় যাকাতের অর্থের আড়াই শতাংশ দিতে হবে। দেশীয় পরিমানে রুপার হিসাবে সাড়ে ৫২ ভরি হলে যাকাত দিতে হবে।

    স্ত্রীর গয়নার যাকাত কে দিবেঃ

     যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুযায়ী স্ত্রীর  যাকাত আদায় করা তার জন্য ওয়াজিব। ধরা যাক স্ত্রীর কাছে ১০ ভরি স্বর্ণ আছে কিন্তু নগদ কোন অর্থ নেই। তাহলে স্বর্ণের কিছু অংশ বিক্রি করেও সে যাকাত দিতে পারবে। আমার স্বামী প্ররিশোধ করতে সক্ষম  হলেও তা ঋণ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। তবে অবিবাহিত মেয়ের স্বর্ণের যাকাত ও বাবাকেই দিতে হবে। 

    আরও পড়ুনঃ রমজানের স্বাস্থ টিপস

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুযায়ী পশু সম্পত্তিঃ

    অনেক গবাদি পশু থাকলে যাকাত দিতে হবে। অন্য কথায় তার যদি কমপক্ষে পাঁচটি উট, ত্রিশটি গরু, মহিশ,৪০ টি ছাগল-ভেড়া বা দুম্বা মোট নিসাব পরিমান থাকে তাহলে তাকে তার পশুর মূল্য নির্ধারণের পর ২.৫ শতাংশ হারে যাকাত দিতে হবে।

     জমিতে উৎপাদিত ফসলের যাকাতঃ

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুযায়ী যদি কারো জমি থেকে ৬১২ কেজি /১৫.৩ মণ কৃষি পণ্য( ধান, গম, ইত্যাদি) পাওয়া যায় তবে সেই পরিমাণ উৎপাদিত ফসল তা নিসাব পরিমাণ সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। উপরন্ত শ্রমিকদের সাহায্যে উৎপাদিত ফসল এবং শ্রমিক ছাড়াই উৎপাদিত মোট ফসল উভয়ের উপর যাকাত দিতে হবে। যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুযায়ী রাসুল (সাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন, “একটি পানিতে উৎপাদিত ফসল এবং উশরি জমিতে উৎপাদিত ফসলের যাকাত ২০ ভাগের এক ভাগ দিতে হবে।’ 

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুযায়ী বনিক পণ্যঃ

    সকল প্রকার স্থাবর -অস্থাবর পণ্যের যাকাত দিতে হবে। তাদের সবচেয়ে সাম্প্রতিক বাজার মূল্য নির্ধারণের পর, যাকাত দিতে হবে আড়াই শতাংশ হারে। 

    আরও পড়ুনঃ শবে কদরে ফজিলত ও আমল

    যাকাত কাদের দিতে হবেঃ

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুযায়ী  ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী নিচের তালিকাভুক্ত মানদণ্ড পূরণকারী প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য যাকাত আবশ্যক। যথাঃ১। মুসলিম.২। আকেল হওয়া.৩। স্বাধীন.৪। বালেগ হওয়া ৫। সম্পদে নিসাবের মালিকানা ৬। সবকিছুর সম্পূর্ণ মালিকানা.৭। সম্পদ অর্জন করার পর একটি পূর্ণ বছর কেটে গেছে।

    যাকাত কাদের দিতে হবেঃ

    অতএব অমুসলিম, চুক্তিবদ্ধ চাকর,উন্মা্‌দ, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং যৌথ সম্পত্তিতে নিশাব পরিমাণে সম্পদের মালিকদের জন্য যাকাত আবশ্যক নয়। যারা পুরো এক বছরের জন্য সম্পদের নীসাব পরিমাণের মালিক নন তাদের জন্য যাকাত আবশ্যক নয়। 

    যাকাত হিসেবে পোশাক দান করা যাবে কিঃ

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশ্লেষনে মুফতি আব্দুল্লাহ বলেন, এটা সঠিক কিন্তু ভালো নয়। তিনি এটিকে তার ন্যায্যতা হিসেবে দেন, যেটি তার উপকারে লাগবে সেটা দিয়েই তাকে যাকাত দেওয়া উচিত।পোশাকের চেয়ে খাবার কারো কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এবং কিছু টাকা প্রয়োজন হতে পারে,এগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অবশ্যই প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে হবে। তিনি বলেন, নগদ অনুদান যদি না থাকে তবে তা পছন্দনীয়।

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুযায়ী কারা যাকাত পাওয়ার যোগ্যঃ

    শুধুমাত্র মুসলমানরা যাকাত পেতে পারে। এর জন্য যোগ্য মুসলিমদের মধ্যে রয়েছেঃ

    • খুবই গরীব মিসকিন মুসলমান। 
    • জিহাদকারী।
    • বিশ্বস্ত দরিদ্র।
    • নব্য মুসলিম।
    • অভাবীএবং শক্তিহীন আত্মীয়।
    • ঋণী ব্যক্তি।

    কেউ ব্যাংক লোন নিলে কি যাকাত দিতে হবেঃ

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশ্লেষনে মুফতি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মতে, যদি কোন ব্যক্তি ঋণ নেয় তাহলে পরবর্তী বছরের জন্য কিস্তির জন্য প্রয়োজনীয় টাকা বাদ দেয়ার পর যে পরিমান অবশিষ্ট থাকে তাতে যাকাত প্রযোজ্য হবে । ব্যবসার জন্য টাকা ব্যবহার না করা হলেও এমনি রাখলেও যাকাত আবশ্যক।যার ঋণ এত বেশি যে তার যাকাতের সম্পদের নীসাব মূল্যের অভাব রয়েছে তার ওপর যাকাত আবশ্যক নয়। 

    যাকাতের তহবিল কি সংস্থায় দান করা যায়ঃ

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশ্লেষনে মুফতি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মতে, যাকাত গ্রহীতাকে অবশ্যই দানকে মালিক নিয়ন্ত্রিত করতে হবে যাতে করে যাকাত আদায় বিশুদ্ধ হয়। যাতে তিনি এটিকে তার বিবেচনা ভিত্তিতে বা তার প্রয়োজনের জন্য সীমাবদ্ধতা ছাড়াই ব্যবহার করতে পারেন। সংগঠনে অর্থ দান করলে, গরিব বা দরিদ্রদের জন্য ব্যয় করার অধিকার নেই। এই অর্থের মালিক কোন গরীব বা দরিদ্র ব্যক্তি নয়। এই কারণে যাকাত হিসেবে নগদ অর্থ প্রদান করা বাঞ্চনীয়। 

    যাকাত অমান্যকারীর কঠিন পরিণতিঃ

    মানবজাতি একটি আশরাফুল মাখলুকাত যা আল্লাহ তায়ালার দ্বারা সৃষ্ট।মহান আল্লাহ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন যেখানে তারা ভালো এবং খারাপ উভয় আচরণে প্রদর্শন করেছে। যারা ভালো পথ বেছে নেয়, তাদের জন্য তিনি জান্নাতে অশেষ নেয়ামত, পূর্ব নির্ধারিত করে রেখেছেন এবং যারা মন্দ,মন্দ পথ বেছে নেয় তাদের জন্য জাহান্নামে কঠোর শাস্তি পূর্ব নির্ধারিত করে রেখেছে।

    যাকাত অমান্যকারীর কঠিন পরিণতিঃ

    আল্লাহ তায়ালা যাকাত বর্জনকারীর শাস্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, যারা স্বর্ণ ও রুপা মজুদ করে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে জানিয়ে দাও যে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি হবে। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত হবে সেদিন তা দিয়ে তাদের কপাল,পার্শ্বদেশ ও মুখমন্ডল তাতে দাগ দেওয়া হবে। আর বলা হবে, এটা তোমরা নিজেদের জন্য সংগ্রহ করেছ। তাই আপনি যা সংরক্ষণ করেছেন তাতে আনন্দ  নিন। 

    যাকাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে নবীজি বলেন,”আল্লাহ যাকে সম্পদ দিয়েছেন কিন্তু তার যাকাত দেননি, কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির সম্পদ তার গলায় টেকো( বিষের তীব্রতার কারণে) মাথাসহ বিষধর সাপের আকারে ঝুলিয়ে রাখা হবে। সাপ তার মুখে দু পার্শ্বে কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্প্‌দ, আমি তোমার জমাকৃত মাল।” 

    নবীজি আরো বলেন,  মহান আল্লাহ যাদেরকে সম্পদশালী করেছেন তারা সে সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করেছে সেই সম্পদ তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না বরং তারা তাদের জন্য অকল্যাণ হবে। অচিরেই কিয়ামত দিবসে যা নিয়ে কার্পণ্য করেছে তা দিয়ে তাদের গলাতে শৃঙ্খলা বদ্ধ করে রাখা হবে। (সূরা আল ইমরান৩/১৮০)। 

    তাই আমাদের  যাদের যাকাত ফরজ হয়েছে তাদের উচিত সঠিক নিয়মে যাকাতের হক আদায় করা। 

     


    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    0 মন্তব্যসমূহ